Amardesh
আজঃ    আপডেট সময়ঃ

বন্যার পানি কমলেও চরম দুর্ভোগে কক্সবাজারের পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ

ডেস্ক রিপোর্ট
বন্যার পানি কমলেও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কক্সবাজার জেলার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। এক মাসের ব্যবধানে দুই দফা বন্যায় প্লাবিত হয়ে চরম দুঃখ-কষ্টে, অনাহারে-অর্ধহারে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন এসব মানুষ। এদিকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে বিধ্বস্ত হাজার হাজার ঘরবাড়ি, ফসলী জমি ও মৎস্য খামারসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতচিহ্ন। শত শত কিলোমিটার কাঁচাপাকা সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় আরো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এসব বানভাসি মানুষদের। গত ২৫ জুলাই থেকে কক্সবাজারে শুরু হয় টানা ভারি বর্ষণ। ২৭ জুলাই থেকে পাহাড়ী ঢলের সঙ্গে পূর্ণিমার প্রভাবে জোয়ারের পানি বেড়ে যাওয়ায় কক্সবাজারের নিন্মাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়। জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, এবারের বন্যায় প্লাবিত হয়েছে ৩৫টি ইউনিয়ন। এতে কক্সবাজারের পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে। ২৯ জুলাই বৃষ্টিপাত একটু কম হওয়ায় পানি কমতে শুরু করে। এরই মধ্যে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ এর প্রভাবে ৩০ ও ৩১ জুলাই ফের টানা ভারি বর্ষণে পাহাড়ী ঢলের সঙ্গে পূর্ণিমার প্রভাবে জোয়ারের পানি বেড়ে যাওয়ায় আরো বেশি এলাকা বন্যায় প্লাবিত হতে শুরু করে। তবে ১ আগস্ট থেকে বৃষ্টিপাত কমতে শুরু করায় বন্যার পানিও কমতে শুরু করে। রোববার কোনো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বন্যায় প্লাবিত জেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার পানি নামতে শুরু করে। এর আগেও গত ২৫ জুন থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত টানা ভারি বর্ষণের সঙ্গে পাহাড়ী ঢলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল জেলার রামু, চকরিয়া, পেকুয়া ও কক্সবাজার সদরসহ বিভিন্ন এলাকায়। এতে জেলার আট লক্ষাধিক মানুষ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছিল। এতে মারা যায় ১৭ জন। কক্সবাজার জেলার সদর, রামু, পেকুয়া, চকরিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও উখিয়ায় বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও বানভাসী মানুষগুলো রয়েছে চরম দুর্ভোগে। পাহাড়ী ঢলে ভেসে গেছে অনেকের বসতবাড়ি। ডুবে গেছে অনেকের বাড়িঘর। কেউ কেউ সহায়-সম্বল হারিয়ে হয়েছে সর্বশান্ত। বানভাসী এসব মানুষ ঘরে ফিরলেও বাড়ির মেঝে স্যাঁতস্যাঁতে হওয়ায় অনেকের রান্না করাতো দূরের কথা- রাত যাপনই করতে পারছে না। ফলে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে এসব মানুষের। রামু উপজেলার সদর ফঁতেখারকূলের হাইটুপিপাড়ার বাসিন্দা সিকদার আলম (৫৫) জানান, গত ২৫ জুন সংঘটিত বন্যায় রামু উপজেলা সদরের সঙ্গে রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কের সংযোগ সড়ক হাইটুপির অধিকাংশ অংশই পাহাড়ী ঢলে ভেঙ্গে বিলীন হয়ে যায়। এটি মূলতঃ সংযোগ সড়ক হলেও বর্ষাকালে বেড়িবাঁধের কাজ করতো। এই কারণে এবারের ভারি বর্ষণের সঙ্গে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল সহজেই হাইটুপি সড়কের বিলীন হওয়া ভাঙ্গা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে পড়ায় প্লাবিত হয় হাইটুপি, ভূত পাড়া, পূর্ব মেরংলোয়া, পশ্চিম মেরংলোয়া, উত্তর মেরংলোয়াসহ আরো কয়েকটি গ্রাম। বন্যায় দুর্ভোগের শিকার একই এলাকার ফজর আলী বলেন, ‘বন্যার পানিতে আমার বসতবাড়ি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বাড়িতে রক্ষিত ৫০ মণ ধান, শুষ্ক মৌসুমে ফলানো দুই মণ আলুসহ অন্যান্য সবজি ঢলের পানিতে ভেসে গেছে। পাশাপাশি ভেসে গেছে বাড়ির ব্যবহার্য্য সব জিনিসপত্র। এখন পানি নেমে গেলেও সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হচ্ছে।’ রামুর মেরংলোয়া গ্রামের দিনমজুর কেরামত আলী জানান, বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তার কুঁড়েঘরের মেঝে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখন ভিজে মেঝেতে রান্নাবানা করাও দায়। বন্যার সময় নলকূপটির ভিতরে পলি ও কাদা জমে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাত যাপনের মতো অবস্থা নেই এখন। ফলে প্রধান সড়কে পরিবার নিয়ে কোনো রকম বসবাস করতে হচ্ছে। রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজুল আলম রাইজিংবিডিকে জানান, রামুর ১১টি ইউনিয়নই এক মাসের ব্যবধানে দুবার বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। গতবারের বন্যায় ৬ হাজারের বেশি বসতবাড়ি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এবারও ২০ হাজারের বেশি বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে কৃষি ও মৎস্য খামারসহ হাজার হাজার একর ফসলি জমির খেত ও ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকটি অভ্যন্তরীণ সড়ক ও বেড়িবাঁধ। এ অবস্থায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও বেড়িবাঁধ এবং রাস্তাঘাট মেরামত করার দাবি জানান তিনি। চকরিয়া পৌর এলাকার কাকরা ইউনিয়নের বাসিন্দা এনামুল হক জানান, বন্যায় তার বসত বাড়ি পানিতে সম্পূর্ণ ডুবে যায়। এতে তার ঘরের আসবাবপত্র সহ অন্যান্য প্রয়োজনী জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পানি নামলেও ভেজা মেঝেতে বসবাস করা এবং রান্নাবান্না করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। পাহাড়ী ঢলের পানিতে তলিয়ে বিলীন হয়ে গেছে চকরিয়ার বরইতলী এলাকার সিদ্দিক আহমেদের বসত বাড়ি ও ধানের গোলা। এখন পানি নেমে গেলেও আট সদস্যের পুরো পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হচ্ছে। তলিয়ে বাড়ির মেঝেসহ পুরো ভিটেতে প্লাবনের সময় পলি জমে যাওয়ায় রান্নাবান্না করাও দায় হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী এলাকার চিংড়ী চাষী ইয়াছিন আরাফাত জানান, পরপর দুবারের বন্যায় তার ১০ একর চিংড়ী ঘের তলিয়ে গিয়ে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে চিংড়ীর এই মৌসুমে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই। চকরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাফর আলম রাইজিংবিডিকে জানান, ফের বন্যায় চকরিয়ার ১৮টি ইউনিয়নই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে ১৪টি সম্পূর্ণভাবে এবং ৪টি ইউনিয়ন আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবারের বন্যায় সাত হাজারের বেশি বসত বাড়ি আংশিক ও সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি দূর্ভোগের শিকার হয়েছে উপকূলীয় পেকুয়া উপজেলার লোকজন। ইতিপূর্বে সংঘটিত বন্যায় পেকুয়া সদর, মগনামা, উজানটিয়া, শিলখালী ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বিলীন হওয়ায় পুরো উপজেলা এবারের বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। একেবারে বিলীন হয়ে গেছে অসংখ্য মাটির তৈরি গুদাম ঘর ও কাঁচা বাড়ি। উপকূলীয় ইউনিয়ন মগনামা, উজানটিয়ার বেশ কয়েকটি এলাকা এখনো ডুবে আছে। পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়ার বাসিন্দা কুসুম বাহার জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে মুরগীর খামার করে সংসার চালাতেন। বন্যার পানিতে তার তিন হাজার মুরগীর একটি খামার তলিয়ে গিয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন তিনি। এখন স্কুলপড়ুয়া দুই ছেলে এবং কলেজ পড়ুয়া মেয়েটির পড়ালেখার খরচ ও সংসার চালানো নিয়ে তিনি দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন। পেকুয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাফায়াত আজিজ রাজু রাইজিংবিডিকে জানান, সমুদ্র উপকূলীয় ইউনিয়ন মগনামা ও উজানটিয়া, মাতামুহুরী নদী সংলগ্ন শিলখালী ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের অধিকাংশ অংশ ভেঙ্গে বিলীন হওয়ায় এখনো বেশ কয়েকটি এলাকার লোকজন পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। এক মাসের ব্যবধানে পরপর দুবার বন্যা হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগও চরমে উঠেছে। তবে জোয়ারের সময় পানি বেড়ে যাওয়ায় দুর্ভোগের মাত্রাও বেড়ে যায় বানভাসী এসব মানুষের। এবারের বন্যায় পেকুয়ায় তিন হাজারের বেশি ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানান উপজেলা চেয়ারম্যান শাফায়াত আজিজ রাজু। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এবারের বন্যায় চকরিয়ার ৮টি, পেকুয়ার ৬টি, কুতুবদিয়ার ৩টি, কক্সবাজার সদরের ২টি, টেকনাফের ২টি, মহেশখালীর ৩টি, রামুর ১০টি ও উখিয়ার ১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বন্যার কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ।’ তিনি জানান, বানভাসী এসব মানুষের মাঝে প্রশাসন পাঁচশ মেট্রিক টন চাল ও নগদ আট লক্ষাধিক টাকা বিতরণ করেছে। এ ছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া পানিবন্দি এসব মানুষের মাঝে রান্না করা খাবার ও শুকনো খাবার সরবরাহ করেছে। দুর্গত মানুষদের চিকিৎসায় কাজ করছে আশ্রয়কেন্দ্র ভিত্তি গঠন করা মেডিক্যাল টিম। কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল জানান, দুদফা বন্যা কক্সবাজার সদর ও রামু ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও বানের পানিতে ভেসে গেছে। এছাড়া কাঁচা-পাকা অনেক সড়ক লণ্ডভণ্ড হয়েছে। এতে বানভাসী মানুষগুলো চরম দুর্ভোগে রয়েছে। তবে সরকারের পক্ষে থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এ ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা-ঘাট মেরামতে জন্য সরকারের পক্ষে থেকে শিগগিরই বরাদ্দ দেওয়া হবে। উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি রাইজিংবিডিকে বলেন, সরকার ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে পূনর্বাসনের ব্যবস্থা নেবে। এ ব্যাপারে প্রতিটি এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রণয়নের জন্য এলাকার জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।