Amardesh
আজঃ    আপডেট সময়ঃ

যান চলাচল নিষিদ্ধ করায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি, ভোগান্তি

ডেস্ক রিপোর্ট
বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে দেশের জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার অটোরিকশা এবং সব ধরনের অযান্ত্রিক যান চলাচল নিষিদ্ধ করায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে গতকাল রোববার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে পাঁচজন আহত হন।
নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় দিনে গতকাল দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে ছয়টি জেলার অন্তত ১৪টি স্থানে অবস্থান নিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন অটোরিকশার মালিক ও চালকেরা। সিলেট ও টাঙ্গাইলে তাঁরা ধর্মঘট পালন করেন। এসব কারণে ভোগান্তিতে পেড়ছেন সাধারণ যাত্রী।
গত ২৭ জুলাই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘সড়কে নিরাপত্তা বিধানে আগামী ১ আগস্ট থেকে সারা দেশের জাতীয় মহাসড়কে থ্রি হুইলার অটোরিকশা এবং সকল শ্রেণির অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’ দুর্ঘটনা এড়াতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে এসব ধীরগতির যান বন্ধের সিদ্ধান্ত এর আগেও নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। তবে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক বলেছেন, জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সম্ভাবনা নেই।
ঢাকার বাইরের আমাদের অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
দাউদকান্দি (কুমিল্লা): কুমিল্লার দাউদকান্দিতে অটোরিকশার চালক-মালিকেরা গতকাল সকাল ১০টার দিকে গাজীপুর গ্রামের কাছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দাউদকান্দি থানার পুলিশ অবরোধকারীদের ওপর লাঠিপেটা করে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে দাউদকান্দি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ফজলুল কবিরসহ পাঁচজন আহত হন। ফজলুল কবিরকে দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সংঘর্ষের সময় যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপসহ কমপক্ষে ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
দাউদকান্দি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রঞ্জন কুমার ঘোষ বলেন, সংঘর্ষের একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ শটগানের ৫৮টি গুলি ছোড়ে।
খবর পেয়ে দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, কুমিল্লার সদর উত্তরের সহকারী পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঁইয়া, কুমিল্লার পুলিশ লাইন থেকে এক প্লাটুন অতিরিক্ত পুলিশ ও চান্দিনা থানা-পুলিশ, দাউদকান্দি হাইওয়ে ও থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
বেলা একটার দিকে দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। অবরোধের কারণে তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
ভাঙচুর হওয়া জোনাকী পরিবহনের বাসের চালক আনোয়ার হোসেন ও পাপিয়া পরিবহনের বাসের চালক মো. জুয়েল বলেন, ভাঙচুরের সময় যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। এ ছাড়া অবরোধের কা রণে যে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সবাই।
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম): সীতাকুণ্ডে গতকাল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফৌজদারহাট-বন্দর সড়কের সংযোগস্থলে অবরোধ করেন অটোরিকশার চালক ও মালিকেরা। বিকল্প সড়ক ও বিকল্প যানবাহন না দিয়ে অটোরিকশা বন্ধ করায় স্থানীয় লোকজন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নারায়ণগঞ্জ: অটোরিকশার চালক-মালিকেরা নারায়ণগঞ্জে গতকাল বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কয়েকটি স্থান অবরোধ করেন। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।
সিলেট: সিলেটে জেলা অটোরিকশা (সিএনজি) শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকা অবস্থান ও ধর্মঘট কর্মসূচির কারণে সিলেটে গতকাল সকাল-সন্ধ্যা অটোরিকশাসহ ছোট যান চলাচল বন্ধ থাকে। সকাল ছয়টা থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার তেতলী, চণ্ডীপুল, গোয়ালাবাজার, ওসমানীনগর, রশিদপুর ও শেরপুর এলাকায় মহাসড়কের পাশে অবস্থান নিয়ে খণ্ড খণ্ড সমাবেশ করেন ওই সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
দক্ষিণ সুরমার রশিদপুর এলাকায় বিকেল চারটার দিকে অটোরিকশা চলাচল করলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা তিনটি গাড়ি ভাঙচুর করেন।
এদিকে অটোরিকশাসহ ছোট যান বন্ধ থাকায় মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে দেখা যায়।
বিশ্বনাথ (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রশিদপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করেন মালিক-চালকেরা।
টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইলে গতকাল ভোর থেকে ৪৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করছেন অটোরিকশার শ্রমিক-মালিকেরা। এদিন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোথাও অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা যায়নি। দুপুরের দিকে টাঙ্গাইল শহরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ডে শ্রমিকেরা একত্র হলে র্যাব তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তাঁরা কোথাও মিছিল-সমাবেশে বা পিকেটিং করতে পারেননি।
টাঙ্গাইলের ট্রাফিক পরিদর্শক শাহ মো. আরিফুর রহমান জানান, নিষেধাজ্ঞার পর মহাসড়ক থেকে অন্তত দেড় শ অটোরিকশা আটক করা হয়েছে।
বগুড়া: নিষেধাজ্ঞার কারণে ঢাকা-রংপুর ও বগুড়া-নাটোর মহাসড়কে অটোরিকশা না থাকায় গতকাল কম দূরত্বের যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সময়মতো বাস না পাওয়ায় এবং কাছের গন্তব্যের যাত্রীদের বাসে না তোলাই এ দুর্ভোগের কারণ। মহাসড়কের কড়াকড়ি আরোপ করায় শহরের ভেতর সড়ক দাপিয়ে বেড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশা।
মহাসড়কের মাটিডালী মোড়ে স্থানীয় পুনট বাজারের মুকুল হোসেন বলেন, ‘ব্যবসার কাজে সপ্তাহে অন্তত দুদিন বগুড়ায় আসতে হয়। এত দিন অটোরিকশায় কম সময়ে অনায়াসে যাতায়াত করেছি। অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়ায় মহাসমস্যায় পড়েছি।’
বরিশাল: ছোট যানের মালিক ও চালকেরা গতকাল সকালে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন। ফলে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে মহাসড়কে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বরিশাল জেলা বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন। গতকাল বেলা একটার দিকে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয় সংগঠনটি। জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আফতাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মহাসড়কে বাস চলাচলে বাধা দিয়েছে অবৈধ যানবাহন চালক-শ্রমিকেরা। প্রশাসন ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রুটসহ দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকবে।’
গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি জানান, গৌরনদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে সকাল নয়টা থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা বিক্ষোভ করেন অটোরিকশার চালক ও মালিকেরা।
মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি জানান, পিরোজপুরে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন অটোরিকশা মালিক-শ্রমিকেরা।
গাজীপুর: গাজীপুর জেলা সিএনজি অটোরিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ব্যানারে গতকাল সকাল শত শত অটোরিকশা মালিক-শ্রমিক স্থানীয় রাজবাড়ী মাঠে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জৈনাবাজার এলাকায় অটোরিকশা চালক-শ্রমিকেরা মহাসড়ক কিছু সময় অবরোধ করে রাখেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
অটোরিকশার চালক আল মনসুর বলেন, তিনি পাঁচ বছর ধরে অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান। মহাসড়কে উঠতে না দিলে কোনো আয়ই করা সম্ভব নয়। তাহলে সংসার চলবে কী করে?
আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক গতকাল বলেন, মহাসড়কে তিন চাকার বাহনের চলাচল ঠেকাতে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, ডিআইজি, ডিআইজি হাইওয়ে এবং এসপিদের অনুরোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিআরটিএর নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেটরা এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করছেন।
সচিব বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে না বুঝে অনেকেই আন্দোলন করছেন। আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে যাবে। মানুষের জীবনও রক্ষা পাবে। তিনি বলেন, জাতীয়, আঞ্চলিক জেলা, স্থানীয়সহ সব সংস্থার অধীন বাংলাদেশে আড়াই লাখ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩ হাজার ৫৭০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
কোনো জেলায় কতটুকু জাতীয় মহাসড়ক রয়েছে তা মানচিত্রের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে জানিয়ে সড়ক সচিব বলেন, ওই মানচিত্র ওয়েবসাইটেও দেওয়া আছে।